» চুক্তির পরও আসছে রোহিঙ্গা

Published: ০৮. ডিসে. ২০১৭ | শুক্রবার

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসা বন্ধে চুক্তি হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। কিন্তু চুক্তির পরও রোহিঙ্গা আসা অব্যাহত আছে। প্রতিনিয়ই নতুন নতুন রোহিঙ্গা যোগ হচ্ছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে। প্রতিদিনই নতুন করে গড়ে ২০০ থেকে ৩৫০ জন রোহিঙ্গা যুক্ত হচ্ছে।

সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার আসেন ৩৫০ জন এবং শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশে প্রবেশ করেন আরও ৩০০ জন রোহিঙ্গা।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবর্সন কমিশন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ আগস্ট থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে দেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ৬ লাখ ৩৭ হাজার ১৭০ জন। তাছাড়া ২৫ আগস্টের পূর্বে দেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪ হাজার ৬০ জন। নতুন-পুরাতন মিলে বর্তমানে দেশে রোহিঙ্গা অবস্থানের সংখ্যা ৮ লাখ ৪১ হাজার ২৩০ জন।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রতিদিনই আমাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছেন। তবে সব মিয়ানমার থেকে আসা নয়। এর মধ্যে কিছু টেকনাফ বা অপর কোনো ক্যাম্প থেকেও শিফটিং করে আসছে।

কারণ যারা অপেক্ষাকৃত ভাল একটা ক্যাম্পে আছে তারা তাদের আত্মীয় স্বজনকে ফোন করে নিজেদের কাছে নিয়ে আসছে। ’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশরাফুল আজাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘চুক্তি ঠিক আছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন কঠিন। কারণ চুক্তি আর বাস্তবতা এক নয়। রোহিঙ্গারা মনে করেন, তারা কোথায় ফিরবে, কার কাছে ফিরবে, ফিরে কী করবেন, সেখানে তাদের কর্মসংস্থান নেই, ফসলি জমি নেই, খাবার নেই, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে না। এর বিপরীতে তারা এখানে ভাল আছে। জরুরি কথা হলো- তারা সেখানে নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। তাই এখনো যারা মিয়ানমারে আছেন, তারা নানাভাবে বাংলাদেশে চলে আসছেন। ’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা কথা বলছেন, ফলে আন্তর্জাতিক প্রত্যাবাসন আইন অনুসরণ করে তাদেরকে ফেরত পাঠাতে হবে। প্রথম কথা হলো- তারা যেতে রাজি কিনা? রাজি হলেও তখন তো মিয়ানমার সরকার তাদের নিবন্ধনের মাধ্যমে ফেরত নিবে। সেটি হবে আরেক দীর্ঘ মেয়াদি প্রক্রিয়া। ’

রোহিঙ্গা বিষয়ক এই গবেষক বলেন, ‘বিষয়টি যেহেতু পোক্ত হয়ে গেছে। তাই এটির সমাধানও সময় সাপেক্ষ। এর জন্য প্রয়োজন সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখা, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে সব সময় সচেতন রাখা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারকে চাপে রাখা। ’

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে কথা হয় আবদুল করিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি আসছি প্রায় দুই মাস হয়েছে। কিন্তু সেখানে আমার বাবা ও দুই ভাই ছিল। এতদিন পর্যন্ত তারা বাংলাদেশে আসার সুযোগ পায়নি। সেখানে লুকিয়ে থেকে কোনো রকম কষ্টে দিন পার করছিল। গত কয়েকদিন আগে তারা রাতের অন্ধকারে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসে। বর্তমানে তারা বালুখালি ক্যাম্পে আছে। ’

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া এবং পার্বত্য জেলা বান্দরবানের মোট সাতটি জোনে ভাগ করে রোহিঙ্গাদের রাখা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং এক এবং দুই নং ক্যাম্পে আছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৭০ জন। ময়নারঘোনা ক্যাম্পে আছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৪৫ জন। উখিয়ার হাকিমপাড়া এবং সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় আছে ২৯ হাজার ১৩৮ জন। টেকনাফ উপজেলার চাকমারকুল (কেরণতলী), উংচিপ্রাং, লেদা, সামলারপুর, নয়াপাড়া রেজিস্ট্রেট ক্যাম্পে সর্ব মোট আছে ৬৫ হাজার ৯৯৫ জন।

এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার তিনটি জোন- সাতমারা, বড়চন খোলা ও বাহির মাঠ ক্যাম্পে আছে ৯ হাজার ৫৭৭ জন।

জানা যায়, বানের স্রোতের মত আসা শরণার্থী রোহিঙ্গাদের থাকার ব্যবস্থা করতে ব্যাপক পরিমাণ ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিন দফায় সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য সাড়ে ৮ হাজার একর ভূমি বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দফায় দুই হাজার একর, দ্বিতীয় দফায় তিন হাজার একর এবং তৃতীয় দফায় সাড়ে তিন হাজার একর ভুমি। কক্সবাজার সদর, রামু, টেকনাফ ও উখিয়া এলাকায় এসব ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২৫ আগস্টের পর থেকে আসা রোহিঙ্গা শরাণার্থীদের পুনর্বাসনে বাংলাদেশ সরকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা নানা ইতিবাচক গ্রহণ করে। মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে মোট ৪১টি। এর মধ্যে উখিয়া উপজেলায় স্থাপন করা হয় ২৭টি (১০টি সরকারি ও ১৭টি বেসরকারি), টেকনাফে স্থাপন করা হয় ১৪টি (৬টি সরকারি, ৮টি বেসরকারি)। তাছাড়া সেনাবাহিনী কর্তৃক ৯টি মেডিকেল টিম পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, সুপেয় পানির জন্য নলকূপ স্থাপন করা হয় ৪ হাজার ৮০৬টি, এর মধ্যে সরকারি ২ হাজার ১৯২টি, এনজিও কর্তৃক ২ হাজার ৬১৪টি। টয়লেট স্থাপন করা হয় ২৭ হাজার ২০১টি, এর মধ্যে সরকারি ৪ হাজার ৯৬৮ ও বেসরকারি ২২ হাজার ২৩৩টি। গোসলখানা স্থাপন করা হয় ১ হাজার ৭০৬টি, এর মধ্যে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তর কর্তৃক স্থাপন করা হয় ৪১৬টি এবং বেসরকারি এনজিও কর্তৃক স্থাপন করা হয় ১ হাজার ২৯০টি। এছাড়াও ১৪টি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রতিদিন সরবরাহ করা হচ্ছে ৫৪ হাজার লিটার পানি, সাতটি ভ্রাম্যমাণ ওয়াটার ক্যারিয়ার (প্রতিটি তিন হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন) এবং ১১টি ওয়াটার রিজার্ভার (প্রতিটি এক হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন) এর মাধ্যমেও নিয়মিত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের বিরামহীন চেষ্টা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। গত ২৩ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আগামী দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে এমন আশাবাদের মধ্যে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে দেশ দুটির মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চুক্তিটি হয়।

Share Button

খোঁজাখুঁজি

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« জুন    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০