» নারায়ণগঞ্জে শামীমপন্থীদের ইট ঝড়ে আহত মেয়র আইভী

Published: ১৬. জানু. ২০১৮ | মঙ্গলবার

নারায়ণগঞ্জ শহরে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিয়ে যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল তাই সত্য হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে মঙ্গলবার বিকালে বন্দর নগরীর আহত হয় অন্তত ৫০ জন। এদের একজন স্বয়ং মেয়র আইভী।

এই ঘটনার জন্য শামীম ওসমান ও আইভী একে অপরকে দায়ী করেছেন। দুই জনই বিনা উস্কানিতে হামলা ও গুলি চালানোর অভিযোগ করেছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এনেছেন দুই নেতাই।

নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরফুদ্দিন বলেন, ‘মেয়র সমর্থকদের সঙ্গে হকারদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। তবে কয় জন আহত হয়েছে জানা নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি ছুড়েছে।’

ডিসেম্বরের শেষ দিকে নগরী থেকে হকার উচ্ছেদ করেছিল সিটি করপোরেশন। আর তাদেরকে বসতে দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন শামীম ওসমান। সোমবার তিনি মেয়রকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, হকাররা নারায়ণগঞ্জে বসবে, এটা তার অনুরোধ নয়, এটা তার নির্দেশ। মেয়র আইভীও জবাব দেন এভাবে যে, নারয়ণগঞ্জ শহর শামীমের এলাকা না। এখানে তার নির্দেশ চলবে না।

দুই নেতার অনঢ় অবস্থানের কারণে সকাল থেকেই নগরীতে ছিল উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। চাষাঢ়ায় শহীদ মিনার এলাকায় অবস্থান নেয় পুলিশও।

যেভাবে বাঁধে সংঘর্ষ

বিকাল ৪ টা ১৮ মিনিটে নগর ভবনের সামনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও কাউন্সিলরদের নিয়ে অবস্থান নেন আইভী। ওখান থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম আবু সুফিয়ান আইভীর পক্ষে কয়েক হাজার নেতাকর্মীদের নিয়ে শোডাউন করে চাষাঢ়ার দিকে আসতে থাকেন।

আইভীর মিছিলে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল কাদির, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম আবু সুফিয়ান, নগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আলী আহম্মদ রেজা উজ্জ্বল ও মেয়রের ভাই আলী আহম্মদ রিপনসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মী।

আইভীর সঙ্গে সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্যরাও ছিলেন।

অন্যদিকে শামীম ওসমানের লোকজন ও উচ্ছেদ হওয়ার হকাররা বিকেল সোয়া চারটার দিকে চাষাঢ়া শহীদ মিনারে অবস্থান নেন।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এহসানুল হাসান নিপু, নগর যুবলীগ সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সাফায়েত আলম সানি, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন, মহানগর কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান লিটনসহ  কয়েক হাজার নেতাকর্মী ও হকার।

বিকাল সাড়ে চারটার দিকে আইভী চাষাঢ়া সায়াম প্লাজার সামনে আসলে সেখানে শামীম ওসমানের লোকজন চাষাড়া শহীদ মিনার থেকে গিয়ে বাধা দেয়। এতে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বেঁধে যায়।

সংঘর্ষের সময় গোলাগুলির শব্দও শোনা গেছে। তবে কে বা কারা গুলি করেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় ইটপাটকেলের নিক্ষেপে আহত হয়ে রাস্তায পড়ে যান মেয়র আইভী। ওই সময় তার নেতাকর্মীরা মানবপ্রাচীর করে আইভীকে নিরাপদ রাখেন। তখন নেতাকর্মীদের উপর ইটপাটকেল লাগলেও তারা আইভীকে নিরাপদ রাখেন।

এর মধ্যে দুই দিক থেকে কয়েকশ পুলিশ এসে দুই পক্ষকে দুই দিকে সরিয়ে দেয়। তারা ক্রমাগত কাঁদানে গ্যাস ও শর্টগানের গুলি ছুড়তে থাকে।

পরে সায়াম প্লাজার সামনে থেকে শামীম ওসমানের লোকজনদের ধাওয়া করে চাষাঢ়া নিয়ে যায় পুলিশ।

এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের সকল মার্কেট বন্ধ হয়ে যায়। যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

বিকাল ৫টা ৫মিনিটে চাষাঢ়া রাইফেলস ক্লাব শেষে বের হন শামীম ওসমান। নেতাকর্মীদের নিয়ে শামীম ওসমান চাষাঢ়া সায়াম প্লাজা পর্যন্ত শোডাউন করেন।

আইভীকে বাঁচাতে ঘিরে ধরেছেন নেতাকর্মীরা।

আহত যারা

পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের সূত্রে জানা যায় সংঘর্ষে মেয়র আইভী ছাড়া  নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দীন সবুজ, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল কাদির, নগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আলী আহম্মদ রেজা উজ্জ¦ল, আইভীর ভাই আলী আহম্মদ রিপন আহত জন। এরা সবাই মেয়র আইভীর সমর্থক।

অপর পক্ষে শামীম ওসমানপন্থী যারা আহত হয়েছে, তারা হলেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল হোসেন ও যুবলীগ নেতা নিয়াজুল ইসলাম প্রমুখ।

গুলিবিদ্ধ হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জেলা পরিষদেরও সদস্য। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে গুলিবিদ্ধ নাসির উদ্দিন, কবির মিয়া ও জসিম উদ্দিনকে।

এই ঘটনায় আহতদেরকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আহত ৩০ জনকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। যার মধ্যে পাঁচ থেকে ছয় জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

আইভী যা বললেন

সংঘর্ষস্থল থেকে ফিরে এসে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইভী। তিনি বলেন, ‘আমরা শান্ত নারায়ণগঞ্জ চাই। আমি শান্তিপূর্ণভাবে লোকজনদের নিয়ে ফুটপাত দিয়ে চাষাঢ়ায় এসেছি। কিন্তু সেখানে বিনা উস্কানিতে আমাদের উপর হামলা করা হয়েছে। নিরীহ লোকজনদের মারধর করা হয়েছে।’

শামীম ওসমান রাইফেলস ক্লাব থেকে গুলি করেছেন অভিযোগ করে আইভী বলেন, ‘তার লোকজন একের পর এক গুলি করেছে।’

পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিও পক্ষপাতের অভিযোগ আনেনন আইভী। বলেন, ‘শামীম ওসমান সকল প্রশাসনের সহযোগিতায় নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলা করেছে। ডিসি এসপি এখানে বসে বসে চামচামি করে। এই ডিসি এসপির প্রত্যাহারের দাবি জানাই।’

‘আমার তো পিস্তল নাই। আমার ক্যাডার বাহিনী নাই। আমি তো পিস্তুল নিয়ে চলি না। হকারদের জন্য হকার্স মার্কেট তো করে দিয়েছি। প্রয়োজনে আরো করে দেবো।’

শামীম যা বললেন

সংঘর্ষের পর চাষাঢ়ায় এসে বক্তব্য রাখেন শামীম ওসমান। তিনি বলেন, ‘যারা খেটে খাওয়া মানুষদের উপর গুলি করেছে তাদের আল্লাহ বিচার করবে।’

‘আমাদের নেতাকর্মীদের উপর লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। আমাদের প্রচুর লোকজনদের মেরে আহত করা হয়েছে। আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নেই নাই। কোন সভ্য দেশের মেয়রের উচিত না রাস্তায় নেমে হকারদের পিটানো।’

পুলিশকে উদ্দেশ্য করে শামীম ওসমান বলেন, ‘আজকে পুলিশ প্রশাসন যা ভূমিকা নিয়েছে নিয়েছেই। কিন্তু আমাকে নামানোর চেষ্টা করা হলে এক হাজার দুই হাজার নামবে না। আমি নামলে এক লাখ দুই লাখ নেতাকর্মীদের নিয়ে নামব।’

এদিকে সন্ধ্যায় শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছে উচ্ছেদ হওয়া হকাররা। আগামীকাল আবার সমাবেশ করার হকারদের নির্দেশ দিয়েছেন শামীম ওসমান।

Share Button