» কোনো বন্ধনই স্থায়ী নয় তাদের!

Published: ২২. নভে. ২০১৮ | বৃহস্পতিবার

আলম রায়হান: আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলমান রাজনীতিতে দেশের দুই সিনিয়র সিটিজেন বেশ আলোচিত। এক জোটের কাণ্ডারি একজন, অন্যজন বিপরীত জোটে সহযোগী হিসেবে বিবেচিত। তারা এখন রাজনীতির দ্ইু মেরুতে। অথচ এই সেদিনও তারা একই কেন্দ্রে ছিলেন। এক সরল রেখায় চলতে শুরু করেছিলেন তারা। মিলিয়ে ছিলেন বুকে বুক, হাতে হাত; ছিলেন ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু তাদের ঐক্যের সুর-তাল কেটে গেল দেশবাসীর ঘোর কাটার আগেই। আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের চলার পথ এখন সমান্তরাল। তারা হচ্ছেন ড. কামাল হোসেন এবং অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
এই সেদিনের ঐক্য ভেঙে তাদের দুজনের পথ বিপরীত মেরুর দিকে আলাদা হওয়া কেবল নয়; বি. চৌধুরী বেশ উচ্চকিত হয়েছেন ড. কামালের বিরুদ্ধে। তিনি ড. কামালকে উদ্দেশ্য করে ১৭ নভেম্বর বলেছেন, ‘যারা শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে, তাদের সঙ্গে ঐক্য করিনি। ড. কামাল হোসেন স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে ঐক্য করলেন। তারা স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বীকৃতি দিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে তারা যখন ঐক্য করলেন তখন আমাদের স্মরণ হয় লাখ লাখ শহীদ ও নির্যাতিত মা-বোনদের। তারাই আমাদের ঐক্যের প্রতীক।’
অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর কী অমৃত বচন! এই হচ্ছে কেবলা বদলকে শুদ্ধ করার জন্য রাজনৈতিক মন্ত্রপাঠ। অথচ যে কারণে তিনি ড. কামাল হোসেনকে দুষছেন সেই একই কর্ম তিনি করেছেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমল থেকে বহু বছর ধরে। চাপের মুখে বঙ্গভবন থেকে অপমানজনক বিদায় নিতে না হলে হয়তো একই কম্ম তিনি এখনো করতেন।
এদিকে একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ড. কামাল হোসেন এখন বিএনপি প্রভাবিত জোটের কাণ্ডারি। আর বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী আওয়ামী লীগ প্রভাবিত জোটের সহযোগী ও করুণা প্রত্যাশী নেতা। অথচ তাদের রাজনীতিতে অধিষ্ঠান ও বিকাশ পর্ব ছিল সম্পূর্ণ আলাদা মেরুতে।
ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর সহযোগী হিসেবে আইনজীবী থেকে দ্রুত রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। এ ধারায় তিনি হয়ে ওঠেন রাজনীতির টাইকুন। কিন্তু সংকটে তিনি আওয়ামী লীগের পাশে থাকেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত পটপরিবর্তনের পর তিনি অনেকটা মৌনব্রত অবলম্বন করেন। এরপরও শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরার পর ড. কামাল হোসেন বেশ গুরুত্ব পাচ্ছিলেন। এমনকি তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তবে এ নির্বাচনে পরাজয় লেখা হলো তার ললাটে। অবশ্য এ পরাজয় তেমন বিরূপ প্রভাব ফেলেনি তার রাজনৈতিক জীবনে; কিন্তু ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে পরাজয় ড. কামাল হোসেনকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দেন। যে ধারা থেকে তিনি আর বের হতে পারেননি। বরং তাকে আওয়ামী লীগ থেকেই বের হয়ে যেতে হয়েছে এক পর্যায়ে। এরপর তিনি গঠন করলেন গণফোরাম। যা গণভিত্তি তৈরি করতে পারেনি কখনো।
দলের চেয়ে বড় নেতা হিসেবে রাজনীতিতে পরিচিতি লাভ করেন ড. কামাল হোসেন। তার এই মাজুল দশার নাটকীয় অবসান ঘটে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে। বিএনপি প্রভাবিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ড. কামাল হোসেন। বেগম খালেদা জিয়াকে আদালতে আইনি সহায়তা না দিলেও এখন রাজনীতির মাঠে তিনি খালেদা জিয়ার মুক্তির পক্ষে কথা বলছেন। অধুনা তিনি বিএনপি দরদি নেতা! যদিও তার মূল ভিত্তি হচ্ছে আওয়ামী দরদি নেতা হিসেবে। হয়তো এ চক্ষুলজ্জা থেকেই তিনি সুযোগ পেলেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার স্মৃতি রোমন্থন করেন। যেন তিনি এখনো বঙ্গবন্ধুর ভাবশিষ্য। কিন্তু বাস্তবে তিনি এখন বিপরীত অবস্থানে আছেন। ড. কামাল এখন তাদের কা-ারি যাদের রাজনীতির সূচনা ও বিকাশ ৭৫-এর হত্যাকা-ের ওপর ভিত্তি করে।
একই অবস্থা ছিল অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীরও। চিকিৎসক থেকে তিনি রাজনীতিক হয়ে যান সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। তিনি হচ্ছেন সামরিক শাসনের টেস্টটিউব বেবি হিসেবে জম্ম নেয়া বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। যে দলটি হচ্ছে ৭৫-এর হত্যাকাণ্ডের বেনিফিসারি। এ দলে থেকেই তিনি মন্ত্রী হয়েছেন, সংসদ উপনেতা হয়েছেন। এমনকি হয়েছেন রাষ্ট্রপতিও। অবশ্য তার সর্বশেষ প্রাপ্তি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। বরং একগাদা অপমানের চাপে রণে ভঙ্গ দিয়ে তিনি বঙ্গভবন থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হলেন। অবশ্য এখানেই শেষ নয়। তাকে আরও অপমানিত হতে হয়েছে বিএনপি সরকারের পুলিশি ধাওয়া খেয়ে রেললাইন পেরিয়ে পালাবার সময়ও। এরপর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে আর এক বঞ্চিত নেতা কর্নেল অলিকে নিয়ে একটি দল গঠন করেন তিনি। তবে তাদের এ দলে বিভাজন আসতে বেশি সময় লাগেনি। এরপর কর্নেল অলি ২০০৮ সংসদে আওয়ামী লীগের বদান্যতায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে সান্ত¦না পুরস্কার লাভ করেন। এতে কিছু দিন তৃপ্ত থাকার পর বিশাল এক অতৃপ্তির তাড়নায় আওয়ামী লীগ সরকারের কৃপার ছায়াতল থেকে বেরিয়ে যান কর্নেল অলি। তিনি নিজেকে এলডিপির প্রধান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে রাজনীতিতে টিকে থাকার পথ বেছে নেন। তবে তিনি ২০ দলীয় জোটের নেতা হিসেবে বিএনপির ওপরই ভরসা করেছেন বেশি। একই ভরসা ছিল অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীরও। এমনকি তাদের বিএনপিতে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তনেরও গুঞ্জন উঠেছিল। তবে বিএনপির অভ্যন্ত থেকে নীরব বাঁধায় এ গুঞ্জন আলোর মুখ দেখেনি।
এরপরও ২০ দলীয় জোটের নেতা হিসেবে কর্নেল অলি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের উদ্যোক্তা নেতা হিসেবে অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপি ঘেঁষা ছিলেন। কিন্তু সেই খোলস খুলে ফেলে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী এখন আওয়ামী লীগের সহযোগী। যেমন বিএনপির সহযোগী সেজেছেন ড. কামাল হোসেন। রাজনীতির কী অদ্ভুত সমীকরণ!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Share Button