» অভিযোগ উঠলেই বদলি না করার দাবি পুলিশের 

Published: ২৩. নভে. ২০১৮ | শুক্রবার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অভিযোগ উঠলেই বদলি না করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে দাবি জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে ইসিকে বলেছেন, নির্বাচনের দায়িত্বপালনকালে বিভিন্ন মহল তাদের বিরুদ্ধে ইসিতে অভিযোগ জমা দিতে পারেন। ওইসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে যেন তাদেরকে অহেতুক বদলি না করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২২ নভেম্বর) নির্বাচন ভবনে ইসির সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রুদ্ধধার বৈঠকে তারা এ দাবি জানান। বৈঠকে পুলিশ সুপার থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। তফসিল ঘোষণার পর এ ধরনের এটাই প্রথম বৈঠক। ওই বৈঠকে পুলিশের অভিযান অব্যাহত না থাকলে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কাও প্রকাশ করেন তারা। তবে ইসি যে দায়িত্ব দেবে তা অনুসরণ করবে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

পুলিশের এসব দাবির সঙ্গে সায় দিয়েছে কমিশন। পুলিশ কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করে ইসি বলেছে, অহেতুক কাউকে বদলি করা হবে না। যেসব রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে মামলা রয়েছে, তাদেরকে বিষয়ে কমিশনের কোনো বক্তব্য নেই। তবে বিনা কারণে কোন ব্যক্তির নামে হয়রানিমূলক মামলা বা গ্রেফতার করা যাবে না। বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

বৈঠকে নির্বাচনের নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণ, মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতিসহ আনুষাঙ্গিক বিষয়গুলো উঠে আসে। এর আগে রিটার্নি কর্মকর্তাদের ডেকে নির্বাচন বিষয়ে নানা পরামর্শ দিয়েছিল ইসি। প্রতীক বরাদ্দের পর সমন্বিত একটি আইনশৃঙ্খলা বৈঠক করবে কমিশন। ওই বৈঠকে রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেবেন।

বৈঠকে সূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ কর্মকর্তার বক্তব্যে বদলির বিষয়টি উঠে এসেছে। তারা বলেছেন, নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করলে একটি পক্ষ বারবারই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে। এসব অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ছাড়া যেন কাউকে বদলি করা না হয়। বৈঠকে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানার ওসিকে বদলির ঘটনায় কেউ কেউ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

আরও জানা গেছে, বৈঠকে পুলিশের আইজি ইসিকে বলেছেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আপনারা যে দায়িত্ব দেবেন তা নিরপেক্ষভাবে আমরা পালন করবো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব বলেন, নির্বাচনে আমাদের সব বাহিনী তৎপর আছে। পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও র‌্যাবের টিমগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।

ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, নির্বাচনে কোনো অনিয়ম না হয় সেবিষয়ে আমরা সর্বদা সতর্ক থাকবো। তবে নির্বাচন ভন্ডুল করার জন্য যেসব দুস্কৃতিকারী, সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে না পারে সেজন্য পুলিশ কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করবে।  বৈঠকে একজন পুলিশ সুপার বলেছেন, এই নির্বাচনে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি মাঠে নেমেছে। ৫ জানুয়ারির (দশম সংসদ) নির্বাচন যারা বানচাল করতে সহিংসতা করেছিল তাদের অনেকেই প্রার্থী হচ্ছেন। এদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ইসির নির্দেশনা চেয়েছেন তিনি। আরেকজন পুলিশ সুপার বলেছেন, চলমান অভিযান বন্ধ করা হলে বিভিন্ন মহল মাঠে নামবে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যেতে পারে। আরেক পুলিশ সুপার বলেছেন, যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে মামলা রয়েছে তাদেরকে নির্বাচনের নামে মার্সি করা যাবে না। এ পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, ফৌজদারি মামলার আসামি গ্রেফতার করা হলে ইসির আপত্তি থাকবে না। এটা আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদেরকে অযথা হয়রানি করা যাবে না।

বৈঠকে আরেক পুলিশ সুপার বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। তবে বৈধ অস্ত্র থানায় জমা দেয়া লাগবে না। ভোটের দিন যাতে এসব বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন না করে সেজন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে। একজন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বৈঠকে বলেন, রিটার্নিং ও সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দেয়ার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য নেই। তবে তাদের নিরাপত্তায় এক-দুইজন পুলিশ সদস্য থাকবেন।

বৈঠকে সিইসি ১২ দফা নির্দেশনা দেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আপনাদের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আপনাদের নৈমত্তিক কাজে হস্তক্ষেপ করবো না। আপনাদের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতার প্রতি নজরদারি করবো। যদি কারো অদক্ষতা অথবা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবার পরিস্থিতি দেখা দেয় তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুবার চিন্তা করবো না। এ সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের ১২ দফা নির্দেশনা দেন সিইসি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- নির্বাচনি কর্মকর্তাদের তালিকা ধরে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেয়া বন্ধ করতে হবে। এতে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের মধ্যে নাশকতাকারী সৃষ্টিকারী রয়েছে কী না সেটা দেখতে হবে।

বিনা কারণে কোনো ব্যক্তির নামে হয়রানিমূলক মামলা করা বা গ্রেপ্তার করা যাবে না। প্রত্যেক এলাকার দলমত নির্বিশেষে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাস্তানদের তালিকা তৈরি করে নজরদারি করতে হবে। সংখ্যালগুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনে বিভিন্ন বাহিনী কোথায় কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে তা নিয়ে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সার্বক্ষনিক সমন্বয় করতে হবে। হাওর-বাওর, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার ভোটকেন্দ্রের মাল পরিবহন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের যাতায়াতের জন্য বিশেষ যানবাহনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সিইসি ছাড়াও সভায় চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব, অতিরিক্ত সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, আইজিপি, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Share Button