» হায়রে পৃথিবী অকৃতজ্ঞের কাছে আমি মৃত?

Published: ২৩. নভে. ২০১৮ | শুক্রবার

শাকিব বিপ্লব ॥ দরিদ্র এক যুবকের উপকারার্থে গত তিন-চার দিন যাবৎ বরিশাল পুলিশ সুপারের কার্যালায় যাতায়াতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্বজন এবং সদালাপি ব্যক্তি হওয়ায় মাত্র ক’দিনেই তার সাথে আমার সখ্যতা তৈরী হয়েছে। এটাই স্বভাবিক। আমিও কেন যেন নিরেট ভদ্র এই পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি দুর্বল হয়ে পরি। পুলিশ সুপারের কার্যালায় যাতায়াতের ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার সকালে ফের সেখানে যাওয়ামাত্র প্রবেশদ্বারের এক কোণে তিন নারী পুলিশ সদস্যের আলাপচারিতা আমার দৃষ্টি কারে। এদের মধ্যকার একজন আমাকে ফলো করে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলো কাকে চাই? উত্তরে স্যারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানানোর সাথে সাথে নীরব হয়ে গেলেন। তার সাথে কথার শেষ না হতেই অপর এক নারী পুলিশ সদস্য আমার নাম ধরে বললেন ভাই কেমন আছেন? কিছুটা অবাক হলাম।
চিনিনা জানিনা অথচ তার ব্যবহারে মনে হলো অনেক দিনের চেনা পরিচয়। তাকে প্রশ্ন করার আগেই তিনি নিয়ে গেলেন স্যারের অভ্যর্থনা কক্ষে। অনিন্দ্য সুন্দরী তরুনী বয়সের এই পুলিশ সদস্য তার পরিচয় দেয়ে মাত্র নিজে কোথায় আছি সেই অনুভূতি শক্তিও যেন হারিয়ে গেল কিছু সময়ের জন্য। এরপর আমার অতীত জীবন নিয়ে নানান আলাপচারিতায় প্রায় অর্ধঘণ্টা সময় মনেই হয়নি এই তরুনীর সাথে আমার আত্মার আত্মীয়তা ছিল। বিস্মিত হলাম তার একটি কথায়। বললেন আপনাকে এক মুরব্বিজন খুবই মনে করে, দেখতে চায়। কিন্তু তার দুই সন্তান তাকে জানিয়েছে শাকিব বিপ্লব আর জীবিত নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। এমন মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়ার কারণ হিসেবে সে জানালো, বর্তমানে গ্রাম থেকে বরিশালে আবস্থানকারী মুরব্বিজন এতই অস্থির যে তাকে এ খবর জানিয়ে নীবৃত করতে এই কৌশল নেয়া হয়েছে। এমনকি আমি যে মৃত তার বাস্তবতা দেখাতে বরিশাল নগরীর নিউ সার্কুলার রোডের অজ্ঞাত এক ব্যক্তির সমাধীস্থল(কবর) দেখানো হয়।
অনেকটা মানুষিক রোগে আক্রান্ত এই নারী তার ভাইজি সম্পর্কের আত্মীয়র বাড়ি নিউ সার্কুলার রোডে হওয়ায় প্রায়শঃ সেখানে যাতায়েত করায় অজ্ঞাত ব্যক্তির সেই কবরকে আমার কবরস্থান ভেবে সেখানে নাকি তিনি থমকে দাঁড়ান এবং জান্নাতবাসী হওয়ার প্রার্থনা করেন। কি নির্মমতা তিনি আমার জন্মধাত্রী ‘মা’ না হলেও আমাকে এক সময় সন্তানের মতোই দেখতেন। কিন্তু নিয়তির খেলায় সেই আত্মীয়তা না থাকলেও এখনো তিনি আমাকে ভোলেননি। অথচ তার কোন এক সন্তান এক সময় আমার জীবনের একটি অঙ্গ ছিল। ছিল একটি মায়াবী এবং ঘটনাবহুল অধ্যায়। তার সেই সন্তান এখন আমার অবদানকে অস্বীকারতো করেই উপরন্ত এতটাই আমি ঘৃনীত হয়েছি যে তার মাকে মুখোমুখী না করার কৌশলগত কারনে আমার মৃত বানান হয়েছে। তাও একটি কুকুরের সাথে ধাক্কায় মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা আমার মৃত্যুর কারণ বলে তার কাছে উল্লেখ করা হয়।
নারী কিনা পারে? কিন্তু সব নারী কি সমান? কেউ হয় রাক্ষসী, সর্বগ্রাসী। আবার কেউ হয় ¯েœহময়ী। উদাহরণতো এখনেই নিহিত। যার মেয়ের জন্য জীবনে অনেক কিছু হারালাম। পেশাগত জীবনে হলাম পঙ্গু। আর্থিকভাবে হলাম সর্বশান্ত। নাম-যশ-খ্যাতি সবই গেল যার কারনে তার কাছে আজ আমি তুচ্ছ এবং মৃত বলে মিথ্যাচারের আশ্রয় একটুও নিতে বুক কাঁপেনি। স্বার্থ মানুষকে কত দূরে নিয়ে যায়। এক সময় এই নারীর কাছে আমি ছিলাম মহানায়ক। তার চেয়ে অধিক যদি বলি সেটা নাকি প্রাণাধিক সমতুল্য। সেই ব্যক্তির আজকের অবস্থান তৈরীর নেপর্থ্যে আমার কি অবদান ছিলো তা বরিশাল কেন দূরজনপদের অনেকেই জানে। তার কাছে আমার প্রতিদান মৃত হওয়াটাইতো স্বাভাবিক। এটাইতো আমার প্রাপ্য প্রতিদান। অকৃতজ্ঞরা প্রতিদান এভাবেই দেয়।
তবুও দানের প্রতিদান এটাই তার মা আমাকে আজও ভোলেনি। অজ্ঞাত ব্যক্তির কবরকে আমার কবর ভেবে দাঁড়িয়ে দেখে তার দু’নয়ন থেকে যে অশ্রু ঝরে সেটাই তো আমার বড় প্রাপ্তি। আর কোন আফসোস আমার থাকতে পারে কি?
বাস্তবতা এটাই আজ আমি অনেকটাই আঁড়ালে। হয়তো সেই নারী বেশ শক্তপোক্ত অবস্থানে আছেন। হয়তো আগামীতেও থাকবেন। সেই রাস্তাতো নিজেকে নিঃশ্বেষ করে তাকে গড়ে দিয়েছি। তাইতো আজ এতো দম্ভ। কিন্তু বিধাতা যদি সত্যিই হয় তাহলে একদিন এই দম্ভ-অহংকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে যাবেই। সেই অপেক্ষায় হয়তো আমার আজও বেঁচে থাকা। শুধু বিধাতাকে বলি সেটাই যেন আমার শেষ দেখা হয়।

Share Button